ইথিলিন গ্লাইকল বিষাক্ততা। A true story
ইথিলিন গ্লাইকল বিষাক্ততা। A true story

ইথিলিন গ্লাইকল বিষাক্ততা। A true story

ইথিলিন গ্লাইকল কি?

ইথিলিন গ্লাইকল হল একটি রাসায়নিক উপাদান। ইথিলিন গ্লাইকল এর সংকেত CH2OH-CH2OH । এটি বর্ণহীন, গন্ধহীন, মিষ্টি স্বাদযুক্ত বিষাক্ত তরল পদার্থ। ইথিলিন থেকে ইথিলিন গ্লাইকল থেকে তৈরী হয়।

C2H4O + H2O → HO−CH2CH2−OH

একটি সত্য ঘটনাঃ

প্যাট্রিসিয়া স্টলিংস নামে একজন মা ছিলেন যাকে তার নিজের শিশু পুত্রকে হত্যার দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু পরে নির্দোষ বলে প্রমাণিত হয়েছিল, এটি একমাত্র সম্ভব হয়েছিল তিনজন অবিরাম গবেষকের কারণে।

ঘটনাটি 1989 সালের গ্রীষ্মে ঘটেছিল যখন স্টলিংস তার তিন মাস বয়সী ছেলে রায়ান কে সেন্ট লুইস শহরের কার্ডিনাল গ্লেনন চিলড্রেন’স হাসপাতালের জরুরি কক্ষে নিয়ে আসেন। শিশুটি অনিয়ন্ত্রিত বমি, গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা এবং শ্বাসকষ্টে ভুগছিল। ওই হাসপাতালের একজন চিকিৎসক রায়ানের উপসর্গগুলি বিশ্লেষণ করেন এবং বলেন যে শিশুটিকে ইথিলিন গ্লাইকল নামক এক ধরণের বিষ প্রয়োগ করা হয়েছিল । এই বিশ্লেষণটি অন্য আরেকটি বাণিজ্যিক ল্যাব দ্বারাও নিশ্চিত করা হয়েছিল।

রায়ান সুস্থ হয়ে উঠলে, তাকে একটি পালক বাড়িতে রাখা হয় এবং স্টলিংস এবং তার স্বামী ডেভিড কে বিশেষ তত্ত্বাবধানে দেখা করার অনুমতি দেওয়া হয়। তারা রায়ানের সাথে দেখা করতে যায়। সেদিন স্টলিংস তার ছেলের সাথে একা ছিলেন এবং দুধ খাওয়াচ্ছিলেন। কিন্তু সেখানে রায়ান আবার অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং সে যাত্রায় শিশুটি মারা যায়। প্যাট্রিসিয়া স্টলিংসকে ফার্স্ট-ডিগ্রি হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছিল এবং তাকে জামিন ছাড়াই আটকে রাখা হয়েছিল। কারণ বাণিজ্যিক ল্যাব এবং হাসপাতালের ল্যাব উভয়েই শিশুর রক্তে প্রচুর পরিমাণে ইথিলিন গ্লাইকোল এবং দুধের বোতলে এর চিহ্ন খুঁজে পেয়েছিল স্টলিংস তার ছেলেকে খাওয়ানোর সময়।

হেফাজতে থাকাকালীন, স্টলিংস জানতে পারেন যে তিনি গর্ভবতী এবং পরবর্তীকালে 1990 সালের ফেব্রুয়ারিতে ডেভিড স্টলিংস জুনিয়র নামে আরেকটি পুত্র সন্তানের জন্ম দেন। তাকে অবিলম্বে একটি পালক বাড়িতে রাখা হয়। কিন্তু দুই সপ্তাহের মধ্যেই নবজাতক শিশুটির মধ্যেও রায়ানের মতোই উপসর্গ দেখা দিতে শুরু করে। কিন্তু এবার কী কারণ ছিল? এবার তো নিশ্চিতভাবে স্টলিংস হেফাজতে থাকার কারণেন তার দ্বিতীয় ছেলেকে বিষ প্রয়োগ করতে পারেনি। এই সময় ডেভিড জুনিয়র মিথাইলম্যালোনিক অ্যাসিডেমিয়া(Methylmalonic acidemia) (MMA) নামে একটি বিরল বিপাকীয় ব্যাধিতে আক্রান্ত হন। MMA হল অ্যামিনো অ্যাসিড বিপাকের একটি রিসেসিভ জেনেটিক রোগ। MMA সাধারণত 48,000 নবজাতকের মধ্যে প্রায় 1 জনের হয়ে থাকে এবং এই রোগের লক্ষণগুলি ইথিলিন গ্লাইকোল বিষক্রিয়ার লক্ষণগুলির সাথে প্রায় মিলে যায়। কিন্তু মিসৌরি শহরের প্রসিকিউটর অফিস এই নতুন ব্যাখ্যা দ্বারা প্রভাবিত হয়নি এবং তারা তাদের বিচারকে এগিয়ে নিয়ে যায়। যাইহোক, উইলিয়াম স্লাই (সেন্ট লুইস ইউনিভার্সিটির বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের চেয়ারম্যান) এবং জেমস শোমেকার (বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি মেটাবলিক স্ক্রিনিং ল্যাবের প্রধান) এই দুই গবেষক টিভিতে এটি সম্পর্কে শুনতে পান এবং তারা বিষয়টি নিয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। যখন শোমেকার রায়ানের রক্ত ​​​​পরীক্ষা করেন তখন তিনি ইথিলিন গ্লাইকোলের কোনো চিহ্ন খুঁজে পাননি। তিনি এবং স্লাই তখন ইয়েল ইউনিভার্সিটি স্কুল অফ মেডিসিনের বিপাকীয় রোগ বিশেষজ্ঞ পিয়েরো রিনালদোর সাথে যোগাযোগ করেন। রিনাল্ডো যখন রায়ানের রক্তের সিরাম বিশ্লেষণ করেন, তখন তিনি মিথাইলম্যালোনিক অ্যাসিডের উচ্চ ঘনত্ব খুঁজে পান যা ব্রাঞ্চড-চেইন অ্যামিনো অ্যাসিড আইসোলিউসিন এবং ভ্যালিনের ভাঙ্গণে উৎপন্ন হয়।

ইথিলিন গ্লাইকল
methylmalonic acidemia
methylmalonic acidemia

Methylmalonyl-CoA mutase নামে একটি এনজাইম রয়েছে যা আইসোলিউসিন এবং ভ্যালিনকে ভেঙ্গে পরবর্তী প্রোডাক্ট সাক্সিনাইল কোএ -তে রূপান্তরিত করে। যদি এই এনজাইমটি ত্রুটিপূর্ণ হয় তবে MMA রোগীদের টিস্যু, রক্ত ​​এবং প্রস্রাবে মিথাইলম্যালোনিক অ্যাসিড জমা হয়। রিনালদো বলেছেন যে শিশুটির রক্ত ​​এবং প্রস্রাবে প্রচুর পরিমাণে কিটোন রয়েছে এবং তিনি শিশুর শারীরিক তরলের নমুনায় কোনও ইথিলিন গ্লাইকল খুঁজে পাননি। বোতলটি পরীক্ষা করা যায়নি, কারণ এটি রহস্যজনকভাবেই যেন উধাও হয়ে গিয়েছিল। রিনালদোর বিশ্লেষণ প্রমাণ করে যে রায়ান MMA থেকে মারা গিয়েছিল।

এখন প্রশ্ন হলো, দুটি ল্যাবের ফলাফল এরকম কীভাবে হলো? কীভাবে তারা ছেলেটির রক্তে ইথিলিন গ্লাইকল খুঁজে পেলেন? তারা উভয়ই কীভাবে ভুল হতে পারে?

রিনালদো যখন ল্যাব রিপোর্টগুলি পেয়েছিলেন, তখন তিনি বলেছিলেন, “ভয়ঙ্কর”৷ একটি ল্যাব বলেছে যে রায়ানের রক্তে ইথিলিন গ্লাইকল রয়েছে যদিও নমুনা রিপোর্টটিতে ইথিলিন গ্লাইকল ধারণকারী নমুনার জন্য ল্যাবের যে নিজস্ব স্ট্যান্ডার্ড প্রোফাইল রয়েছে সেটির সাথে মেলেনি। রিনালদো বলেছেন, “এটি কেবল সন্দেহজনক ব্যাখ্যার বিষয় ছিল না। তাদের বিশ্লেষণের মান অগ্রহণযোগ্য ছিল।” এবং দ্বিতীয় পরীক্ষাগার সম্পর্কে কি? রিনাল্ডোর মতে, সেই ল্যাবটি রায়ানের রক্তে একটি অস্বাভাবিক উপাদান শনাক্ত করেছে এবং কোনো রকম বিশ্লেষণ ছাড়াই ধরে নিয়েছে এটি ইথিলিন গ্লাইকল। সেই বোতলেও ইথিলিন গ্লাইকলের প্রমাণ রয়েছে বলে দাবি করেছে ল্যাব।

রিনালদো মামলার প্রসিকিউটর জর্জ ম্যাকএলরয়ের কাছে তার ফলাফল উপস্থাপন করেন, যিনি পরের দিনই একটি প্রেস কনফারেন্স ডেকে সাংবাদিকদের বলেন, “আমি আর পরীক্ষাগারের তথ্য বিশ্বাস করি না”। ম্যাকএলরয় তারপর 20 সেপ্টেম্বর, 1991-এ প্যাট্রিসিয়া স্টলিংসের বিরুদ্ধে সমস্ত অভিযোগ খারিজ করে দেন এবং তাকে মুক্তি দেয়া হয়।

Similar contents:

1.গ্লুকোজ কিভাবে দেহে নিয়ন্ত্রিত হয়?

2.রাতে ঘুম না হলে যেসব ক্ষতি হয়।

One comment

  1. Pingback: প্রস্রাবের রং কালো। একটি জেনেটিক রোগ - awesomeBiochem

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *